 Moderator Forum Expert

Regist.: 02/08/2011 Topics: 60 Posts: 781
 OFFLINE | প্লেসমেন্ট বাণিজ্য: ব্যাপক ক্ষতির মুখে বড় বিনিয়োগকারীরা
আলতাফ মাসুদ, ২১ মার্চ (শীর্ষ নিউজ ডটকম): প্রাইভেট প্লেসমেন্টের নামে পুঁজিবাজারে অনৈতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েকটি কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন প্লেসমেন্টধারীরা। পুঁজিবাজারের বিপর্যয় অথবা কারসাজির কারণে সব সময় ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির শিকার হলেও এবার বড় বিনিয়োগকারীরাও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) প্রস্তাব অনুযায়ী বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সংশোধন হলে কমপক্ষে হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির শিকার হবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় থাকা বিভিন্ন কোম্পানির প্লেসমেন্টধারী বড় বিনিয়োগকারী। এদিকে, বেআইনিভাবে স্টক এক্সচেঞ্জের বাইরে উচ্চমূল্যে প্লেসমেন্ট বিক্রি করলেও পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় সেসব শেয়ার ফেরত নেয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই বলে জানিয়েছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তবে, মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদনের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) নিজেই অবৈধ প্লেসমেন্ট ব্যবসার সুযোগ করে দেয়ার মাধ্যমে কিছু কোম্পানিকে বেআইনিভাবে লাভবান করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, এসব প্লেসমেন্টধারীর অধিকাংশই পুঁজিবাজারের বড় বিনিয়োগকারী, স্টক ব্রোকার ও সরকারের বিভিন্ন প্রভাবশালী কর্মকর্তা। ২০১০ সালে শেয়ারের অতি মূল্যায়নের ফলে পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণের অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কোম্পানি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করে। পুঁজি সংগ্রহের প্রাথমিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এসব কোম্পানি এসইসির নিকট থেকে মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদন নেয়। কমিশন থেকে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডার বা নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য শেয়ার বরাদ্দের অনুমোদন দেয়া হলেও অনেক কোম্পানি অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে গণহারে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করছে। এক্ষেত্রে শেয়ারের মালিকানা হস্তান্তরের নির্ধারিত ফরমে (১১৭) আগাম স্বাক্ষর দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক। মূলধন বৃদ্ধির অনুমোদন পাওয়া এসব কোম্পানি প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের স্টক ব্রোকার, ডিলার, বড় বিনিয়োগকারীসহ সরকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বর্ধিত মূলধন উচ্চমূল্যে বিক্রি করে। এতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো প্লেসমেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করে হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ার।
ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জের (ডিএসই) হিসাব মতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির জন্য ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ১৪টি কোম্পানি রোড শো করেছে। জানা গেছে, এসব কোম্পানির প্রায় প্রতিটি বিক্রি করছে শত শত কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার। ডিএসইর তালিকার বাইরে অন্তত ১০টি কোম্পানি রয়েছে যারা প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণের অর্থ পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করেছে। এরমধ্যে একমাত্র ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট লিমিটেডকে এসইসি আইপিও'র অনুমোদন দিয়েছিল। যদিও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সে আইপিও অনুমোদন বাতিল হয়ে যায়।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বড় ধরনের প্লেসমেন্ট বিক্রি করা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেড, ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট লিমিটেড, লংকা বাংলা সিকিউরিটিজ, জিএমজি এয়ারলাইন্স, এসটিএস হোল্ডিংস (এপোলো হাসপাতাল), আনন্দ শিপইয়ার্ড অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠান প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করেছে বলে জানা যায়। বিতর্কিত বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে এসব কোম্পানি উচ্চমূল্যে এ প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করেছে। এছাড়াও নাভানা রিয়েল এস্টেট, এলায়েন্স হোল্ডিংস, কেওয়াসিআর কয়েল, সামিট শিপিং, গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রিজ, ফারইস্ট নিটিং এন্ড ডাইং, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ বিপুল পরিমাণের প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করেছে। এসব কোম্পানি বুক বিল্ডিং পদ্ধতি ছাড়াও ফিঙ্ড প্রাইস পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। তবে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক ধসের কারণে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল করা হলে এসব কোম্পানির প্লেসমেন্টধারীরা বিপাকে পড়েন। দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ করা অর্থ আটকে যাওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে তৈরি হয়েছে নতুন সঙ্কট। পূর্বের বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বাতিল করে নতুনভাবে সংশোধণের যে প্রস্তাব এসেছে তাতে এসব প্লেসমেন্টধারীরা বিপুল পরিমাণের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। এসইসির প্রস্তাবানুযায়ী, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কোনো কোম্পানির শেয়ারের দর নির্ধারনের ক্ষেত্রে পিই রেশিও সর্বোচ্চ ১৫ অথবা শেয়ারের সম্পদ মূল্যের ৫ গুণ পর্যন্ত বলা হয়েছে। তবে এসইসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পিই রেশিও অথবা সম্পদ মূল্যের মধ্যে যেটি কম হবে সেটিই শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ধরতে হবে। নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসইসির এ প্রস্তাব গৃহীত হলে শেয়ারের দর যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, এ পদ্ধতি কার্যকর করা হলে তালিকাভুক্তির সময়েই শেয়ারের অতি মূল্যায়নের বিষয়টি আর থাকবে না। যেমনটি পূর্বে কয়েকটি কোম্পানির তালিকাভুক্তির সময়ে অতিমূল্যায় হয়েছিল।
জানা যায়, উল্লেখিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ প্লেসমেন্ট বরাদ্দ দিয়েছে ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেড। কোম্পানিটি তার পরিশোধিত মূলধন থেকে ৭৫ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করেছে ৫শ ২৫ কোটি টাকায়। ঘোষণা অনুযায়ী প্লেসমেন্ট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেড ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার বিক্রি করেছে ৭৫ টাকায়। তবে, কয়েক হাত ঘুরে এ শেয়ার আরো বেশি দরে বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১০ সালে এ কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) হচ্ছে ৩ দশমিক ৪১ টাকা। সম্পদ পুনঃমূল্যায়নের পর এ কোম্পানির শেয়ার প্রতি সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৩৭ টাকা। এসইসির প্রস্তাব অনুযায়ী বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সংশোধন হলে এ কোম্পানির নির্দেশক মূল্য হবে ৫১ দশমিক ১৫ টাকা। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে শেয়ারের দর ২০ শতাংশ কম-বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে শেয়ারের দর সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৩৮ টাকা হতে পারে। এ হিসাবে প্লেসমেন্টধারীর শেয়ার প্রতি লোকসান হবে সর্বনিম্ন ১৩ দশমিক ৬২ টাকা।
প্লেসমেন্ট বিক্রির ক্ষেত্রে এরপরের অবস্থান হচ্ছে ইউনিক হোটেল এন্ড রিসোর্ট লিমিটেডের। কোম্পানিটি পরিশোধিত মূলধন থেকে মাত্র ৩০ কোটি টাকার শেয়ার প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করেছে ৪শ ৮০ কোটি টাকায়। কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি করেছে ১শ ৬০ টাকায়। এ কোম্পানির প্রতিটি শেয়ারের নির্দেশক মূল্য ধরা হয়েছে ১শ ৮৫ টাকা। ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সালের ছয় মাসের প্রতিবেদনে এ কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় সর্বোচ্চ ৬ টাকা দেখানো হয়েছে। যদিও পূর্ববর্তী বছরগুলোর সাথে ২০১০ সালের এ পরিসংখ্যান মেলানো দুস্কর। ২০০৯ সালে এ কোম্পানির ইপিএস ২ দশমিক ০৬ টাকা, ২০০৮ সালে দশমিক ৫৪ টাকা এবং ২০০৭ সালে ইপিএস ছিল দশমিক ২২ টাকা। যদি ২০১০ সালের ইপিএস ধরা হয়, তাহলে এসইসির বুক বিল্ডিং পদ্ধতির সংশোধনীর প্রস্তাব অনুযায়ী এ কোম্পানির নির্দেশক মূল্য সর্বোচ্চ ৯০ টাকা হতে পারে। সেক্ষেত্রে এ কোম্পানির প্লেসমেন্টধারীরা বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ অর্থ লোকসানের সম্মুখীন হবেন।
একইভাবে লংকা বাংলা সিকিউরিটিজ, জিএমজি এয়ারলাইন্স, এসটিএস হোল্ডিংস (এপোলো হাসপাতাল), নাভানা রিয়েল এস্টেট, এলায়েন্স হোল্ডিংস, কেওয়াসিআর কয়েল, সামিট শিপিং, গোল্ডেন হারভেস্ট এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রিজ, ফারইস্ট নিটিং এন্ড ডাইং, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছেন পুঁজিবাজারের বড় বিনিয়োগকারীরা।
এ প্রসঙ্গে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ শীর্ষ নিউজ ডটকমকে বলেন, প্লেসমেন্ট এমনিতেই একটি অনৈতিক বাণিজ্য। এসইসির কারণেই পুঁজিবাজারে রমরমা প্লেসমেন্ট বাণিজ্য হয়েছে। মার্কেটের শেয়ারের অতি মূল্যায়নের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির উচ্চ মূল্যে বিক্রি করা প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনে যদি কেউ লোকসানে পড়েন তাহলে কি বলার আছে। কারণ এ বাণিজ্য তো স্টক এঙ্চেঞ্জের বাইরে হয়েছে। তিনি বলেন মূলত প্লেসমেন্টের শেয়ারের ক্রেতা ছিলেন কিছু বড় বিনিয়োগকারী এবং স্টক ব্রোকাররা। যদি বুক বিল্ডিং আইন সংশোধন হয় তাহলে তাদের আর্থিক ক্ষতির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। |