 Moderator Forum Addict

Regist.: 01/09/2011 Topics: 31 Posts: 155
 OFFLINE | বিনিয়োগকারীরা এখনো কি সঠিক শেয়ার কিনছেন?
আবু আহমেদ
আমাদের শেয়ারবাজারটা পড়ে গিয়ে কিছুটা উপকারও হয়েছে বটে। কারণ সত্যিকার বিনিয়োগকারীরা কম মূল্যে বেশি শেয়ার ক্রয় করতে পারছেন। অন্য দিকে শেয়ারবাজার উঠতে উঠতে যদি ১০০০০ সূচকে উঠে যেত, তাহলে আমরা কি বাজারটা সেখানে ধরে রাখতে পারতাম? আমাদেরকে বুঝতে হবে, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটো উপাদান অতি গুরুত্বপূর্ণ : এক. যে কোম্পানির শেয়ার কেনা হচ্ছে সেই কোম্পানির ব্যবসায়িক সফলতা কেমন। দুই. সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্খা। এ জন্যই সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্খা গুরুত্বপূর্ণ যে, কোম্পানিগুলোতে তাদের বার্ষিক লাভের ব্যাপারে জাতীয় অর্থনীতি থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আমাদের অর্থনীতি ৬ শতাংশ হারে বাড়লে করপোরেট জগতের লাভ হবে এক রকম, আর ৭ শতাংশ হারে বাড়লে লাভ হবে অন্য রকম। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতিতে যেকোনো অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধির বড় হিস্যা পাবে করপোরেট জগৎ, অর্থাৎ শেয়ারবাজারে আছে এমন কোম্পানিগুলো। আমাদের বাজার যে ৯০০০ সূচক ছুঁই ছুঁই করছিল, সে অবস্খাটা আমাদের ম্যাক্রো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সাথে কি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল? যদি তা না হয়, তাহলে তো বাজার একদিন পড়ারই কথা ছিল। আমাদের ক্ষেত্রে সমস্যা হয়েছিল, শেয়ারবাজারের রেগুলেটরের অনুমতি নিয়ে অনেক চালাক উদ্যোক্তা এবং সেই সাথে ঋণ বিক্রেতা ব্যাংকগুলো, এই বাজারে আমাদেরকে এমন চূড়ায় উঠিয়ে দিয়েছিল যে, চূড়ায় আরোহণের পথে ওই সব উদ্যোক্তা হিসেবে বাইরে লাভবান হয়েছিলেন এবং ব্যাংকগুলোও তাদের লাভের বড় একটা অংশ ঋণ বেচার সুদ থেকে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। যখন সাধারণ সূচক ৭০০০ অতিক্রম করছিল, তখনই সতর্কঘন্টা বাজানো উচিত ছিল। তা না করে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ব্রোকারদের নতুন ব্রাঞ্চ খুলতে অনুমতি দিয়েছে এবং ১৪০ টাকার অভিহিত মূল্যের শেয়ারকে ১০ টাকায় রূপান্তরিত করার অনুমতি দিয়েছে। এই যে সবার চোখের সামনে চাহিদার একটি বিস্ফোরণ ঘটানো হলো, তারই ফল হলো ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে শেয়ারবাজারে সুনামির বারবার আঘাত। ওই আঘাতে অনেক বিনিয়োগকারীর আশা-আকাঙ্ক্ষা অনেক বছরের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে। তাঁরা শেয়ারবাজারে আর কোনো দিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন কি না সন্দেহ। আমরা আশা করি, অনৈতিক পন্থায় এবং অন্যায়ভাবে শেয়ারবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা কিভাবে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পকেটে গিয়ে পড়ল, সে ব্যাখ্যা কমিটির রিপোর্টে উঠে আসবে। তবে একটা ব্যাপার অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আমাদের বাজারে এখনো অনেক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন। সেসব আশু সমাধানযোগ্য সংস্কারগুলোর বিষয়েও কমিটির রিপোর্ট একটা দিকনির্দেশনা দেবে বলেই প্রত্যাশা। প্রত্যেক দেশেই কেলেঙ্কারির পরই শেয়ারবাজারের বড় সংস্কারগুলো সম্পন্ন হয়েছে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশেও তা-ই হবে।
এখন অন্য দু’টি কথা বলতে চাই। বিনিয়োগকারীরা আজো যে মূল্যে শেয়ারগুলোকে কিনছেন, সেই মূল্য কি শেয়ারের উঠতিমূল্য? শুধু জুয়া খেলার জন্য শেয়ার কেনা এক ব্যাপার, আর অল্প লাভ হবে, তবে লোকসান হবে না এ উদ্দেশ্য নিয়ে শেয়ার কেনা অন্য কথা। সে দিন একটা বিশ্লেষণ নজরে এলে তা পড়ে আমি হতবাক। সেটা হলো একটা ছোট গ্রুপের চার-পাঁচটি শেয়ার বিক্রি হচ্ছে এই রকম : বহুজাতিক কোম্পানির যেটি ভালো ডিভিডেন্ড বা মুনাফা দেয়, তার আয়ের অনুপাতে ১৫ গুণে অর্থাৎ P/e (x) = 15-তে, অন্য দিকে একই শ্রেণীতে দেশীয় একটি অতি দুর্বল কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হচ্ছে আয়ের ৩০ গুণ। তা হলে আপনি বিনিয়োগকারীদের এই আচরণকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? লেখাপড়া জানা প্রত্যেক লোকে বলবে, এটা শুধু Irrational বা অযৌক্তিক শেয়ারবাজারে Irrationality কাজ করে। কিন্তু তাই বলে আমাদের বাজারে যেভাবে এই উপাদান কাজ করছে, তা ভাবতে অবাক লাগে। অনেকে মনে করছেন, জুয়ার আইটেমের পেছনে দৌড়ে তারা তাদের হারানো পুঁজিকে পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। কিন্তু সেই আশা আমি অন্তত দেখি না। বরং ভালো কৌশল হচ্ছে, ভালো শেয়ারে বিনিয়োগ করে দুই-তিন বছর অপেক্ষা করা এবং তাতে লোকসান অবশ্যই উঠে আসবে বলেই আমার বিশ্বাস।
আমি আপনাদেরকে আরো অনুরোধ করব, না জেনে কোনো শেয়ারই কিনবেন না। কিছুটা চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা এ ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হয়। অনেকে বিষয়গুলো আগ থেকেই জানেন। যারা জানেন না তাদেরকে প্রাথমিকভাবে অন্তত কিছু বইপুস্তক পড়ে নিতে হবে। আমার নিজ অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার আলোকে আপনাদের জন্যও একটি বই লিখেছি। এই বইটি পড়ে অনেকেই প্রভূত উপকৃত হয়েছেন। আপনারাও হবেন। প্রাথমিক জ্ঞান হয়ে গেলে পরে কিছু গবেষণা বা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে কোন শেয়ার কী মূল্যে কিনবেন, তা স্খির করবেন এ নীতি যদি অবলম্বন করেন, তাহলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই জয়ী হবেন।
লেখক : অর্থনীতিবিদ
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৮/০৩/১১] |