 Moderator Forum Addict

Regist.: 01/09/2011 Topics: 31 Posts: 155
 OFFLINE | শেয়ার কেলেঙ্কারী: অর্থমন্ত্রী কি নাগরিক ভাষার প্রতি দৃষ্টি দেবেন
ওমর বিশ্বাস
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শেয়ার কেলেঙ্কারীর ঘটনায় যে তদন্তকারী কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেই কমিটি তাদের তদন্ত রিপোর্ট অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছেন। যতটুকু জানা যায়, অনেক কিছুই রিপোর্টে আছে। স্পষ্টতাও আছে, অনেক অস্পষ্টতাও আছে। তদন্ত কমিটির প্রধান, কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খন্দকার ইব্রাহিম খালেদের মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্য থেকে এটুকু পরিষ্কার যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুপারিশ থাকলেও জড়িতদের শাস্তির ক্ষেত্রে তেমন কোনো সুপারিশ আছে বলে জানা যায়নি। তবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জড়িতদের নাম বাদ দিয়ে আগামী পনের দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর এখন শেয়ার কেলেঙ্কারীর বিচার প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যেই বিষয়টি বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্ষোভ, হতাশা, বিতর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেশের নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নানা ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। আশা করা যায়, অর্থমন্ত্রী শিগগিরই নাগরিক ভাষার প্রতি তার যথার্থ দৃষ্টি দিতে পারবেন।
বলা হচ্ছে, যারা শেয়ার বাজার থেকে ফায়দা লুটেছেন তারা আইনের মধ্যে থেকেই সেই সুযোগ নিয়েছেন। আবার পত্রিকার ভাষায় বোঝা যায় তদন্তকারীরাই তাদের পরোক্ষভাবে অনৈতিক কাজের জন্য দায়ী করেছেন। অনৈতিক কাজ কি দুর্নীতির মধ্যে পড়ে না? তাদের নানা বক্তব্য মেলালো কারা দোষী নাম, কিভাবে দোষী মেলানো যায়। আইনের মধ্যেই অনৈতিক কাজ করেছে। তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হইনি। কিন্তু যে সকল বিষয় বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে তাতে জড়িত কারা সেসবও উঠে আসছে। ধরে নিলাম তদন্ত কমিটি কোনো প্রকার সুপারিশ করবে না, কিন্তু তাই বলে সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল মন্ত্রী, যার সাফল্য-ব্যর্থতাও শেয়ার বাজারের সাথে অনেকাংশেই জড়িত, যিনি এর দায় নিজেই এড়াতেও পারেননি, তিনি যদি বলেন কারো নাম প্রকাশ করা হবে না, তাহলে এর থেকে হতাশার বিষয় আর কি হতে পারে? সামগ্রিক অর্থেই তার এই বক্তব্যে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত শেয়ার বিনিয়োগকারীই নয়, দেশের সাধারণ মানুষও হতাশ হয়েছে। ছোটবড় সব মিলিয়ে যেখানে তেত্রিশ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে তাদের সাথে এরকম আচরণ জনগণের সাথে পরিহাসের শামিল।
শেয়ার বাজার থেকে কত টাকা গেছে তা নিয়েই দ্বিধার জন্ম দিয়েছে। ২০১১ জানুয়ারিতে শেয়ার বাজারের চূড়ান্ত পতনের পর তদন্ত কমিটির প্রধান ইব্রাহিম খালেদই মিডিয়ায় বলেছিলেন, পনের হাজার কোটি টাকা লুটে নেয় হয়েছে। তখন বাজারে চুরাশি হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে বলে গুঞ্জন চলছিল। বিরোধী দলও সেই টাকার হিসাব দাবি করেছিল। আর রিপোর্টের পর পাঁচ হাজার কোটি টাকার খবর বেরিয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠনের পর প্রশ্ন উঠেছিল সঠিক খবর জনগণ জানতে পারবে কিনা? সঠিক তদন্ত হবে কিনা? ইব্রাহিম খালেদের পনের হাজার কোটি টাকা লুটের বক্তব্যের সত্যতাই বা পাওয়া যাবে কিনা? তবে যেটুকু রিপোর্ট হয়েছে তাই তো আঁতকে উঠার মতো। সেখান থেকেই রিপোর্টের আলোকে বিচার হতে পারে। জনগণের দাবি অনুযায়ী বিচার ও স্বচ্ছতার স্বার্থে আইনের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে বিচার হতে পারে। তবে চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে পুনরায় তদন্ত হতে পারে যাতে কেউ বিনা কারণে দোষী সাব্যস্ত না হয়।
ইতোমধ্যেই সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ হচ্ছে। জড়িতরা রাষ্ট্রের চেয়ে ক্ষমতাবান হতে পারে না বলেই বিশিষ্টজনেরা মন্তব্য করেছেন। তবে ‘ক্ষমতাবানরাই কেলেঙ্কারী করে’ বলেও একজন অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন। এরা যদি বারবার এরকমই করে তাহলে আজকের এই রিপোর্ট হবে মূল্যহীন। মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা নয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের কাছে সাধারণ মানুষ অনেক কিছু আশা করে। তারা হয়তো জানে টাকা ফেরত পাওয়া বা ফেরত দেয়া সম্ভব নয় তবে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার ভালো করনীয়টাই করবে, যা তাদের জন্য সান্ত্বনার হতে পারে। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে যেভাবে টাকা হাতানো হয়েছে তা তো তদন্তে এসেছে, তাহলে সেই টাকার ব্যাপারের কিছুই কি করার নেই। দেশে যদি সেই টাকা থাকে তাহলে তো টাকা আদায় সম্ভব হতে পারে? বিদেশে গেলে তো আরো ভালো করে তার তদন্ত হতে পারে। আবার জানা যায়, বিদেশেও টাকা গেছে। সে ক্ষেত্রে আশা করা যায় উপযুক্ত তদন্ত হবে। এখানে মানিলন্ডারিং হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘শেয়ার কেলেঙ্কারীর হোতারা ঠাণ্ডা মাথার খুনী’। দলমত নির্বিশেষে এক কথা নির্দ্বিধায় অনেকের জন্য এতটুকু সান্ত্বনার বিষয় যে, এত কঠিন সত্য কথা এপর্যন্ত কেউ বলতে পারেনি। তাহলে যারা এর সাথে জড়িত থেকে ক্ষুদ্রক্ষুদ্র বিনিয়োগ কারীদের কষ্টের ঘাম চুষে নেয় তারা কোনো ভাবেই ভালো কাজ করতে পারে না। তারা কোনোভাবেই সুস্থ মানসিকতার লোক হতে পারে কিনা তা নিয়েই এখন ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কেউ কেউ বলছেন, ব্যবসায়ীর কোনো দলের হয় না। একথাটা কি পুরোপুরি ঠিক? ক্ষেত্র বিশেষে ব্যতীত, দলের না হলে তো যে কোনো ধরনের সিন্ডিকেশন, মজুদদারী বা ব্যবসায় অধিক মুনাফার মাধ্যমে ফায়দা লুটে নেয়া সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে কি সম্ভব? টেন্ডার ব্যবসার কথা না হয় বাদই। সাধারণ মানুষ বা সাধারণ ব্যবসায়ীরা সাধারণ অর্থেই অনৈতিক কাজ করার সাহস রাখে কি? যারা ব্যবসার নামে কারসাজি করে তারা কোনো না কোনোভাবে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে ভালো ভাবে জেনেই করে। অতীতে দলীয় আনুগত্যের ব্যানারে অনেক ফায়দা লুটতে দেখা গেছে। না হলে অর্থমন্ত্রীই বা বলবেন কেন তারা অনেক ক্ষমতাবান।
জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের জন্যই পুরো রিপোর্ট প্রকাশ করা উচিত। দোষীদের শাস্তি দেয়া উচিত। একবার শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি হলে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়া কঠিন। ১৯৯৬ সালের জড়িতের বিচার হয়নি বলেই ২০১১ সালের ঘটনাটি আবার ঘটতে পারলো। যদি সেই সময়ের জড়িতদের শাস্তির দৃষ্টান্ত থাকতো তাহলে তেত্রিশ লাখ বিনিয়োগকারী এভাবে একসাথে নিঃস্ব হতো না। তদন্তে সংস্কারের বিষয়টি দ্রুত দেখা হোক। আর জড়িতদের ব্যাপারে ব্যাবস্থা নেয়া হোক। সে ক্ষেত্রে যদি কিছু দিন সময়ও লাগে তাহলেও ভালো। ক্ষেত্রবিশেষে যদি পুনরায় তদন্ত লাগে তা করা যেতে পারে। সাধারণ মানুষের শেয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করাই কি ছিল অপরাধ? বিনা কারণে তেত্রিশ লাখ বিনিয়োগকারী লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়ে যে শাস্তি পাচ্ছে, আর বৈধ-অবৈধ লুটের মাধম্যে লুটেরারা ধরাছোঁয়ার বাইরের থাকবে তা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। লুটেরারা তো সমাজের ‘ঠাণ্ডা মাথার খুনী’।
যাদের নাম এসেছে তারা অনেক ক্ষমতাবান বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে অর্থমন্ত্রী এটা পরিষ্কার করে বলেননি যে তারা আইনের উর্ধ্বে কিনা? তারা যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন রাষ্ট্রের তো তারা নাগরিক। এক নাগরিকের জন্য যে আইন নিঃসন্দেহে তাদের জন্য আইন সেটাই। ভিন্নটা নয়। তাহলে কেন অর্থমন্ত্রীর এ ধরনের কথা? এখন তো দলমত নির্বিশেষেই এসব বিষয়ে কথা উঠছে। ‘ক্ষমতাবানরা’ রাষ্ট্রের আইনের উর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে পারে না।
সব দোষ সিকিউরিটি এন্ড একচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এর ঘাড়ে চাপিয়ে একপেশে করা হয়েছে তদন্তকে বলেও মন্তব্য এসেছ। তদন্ত কমিটির প্রধান নানা কথা বলেছেন। আরো সময় নিয়ে তদন্ত হওয়ার দরকার ছিল বলে মন্তব্য করলেও তিনি সময় নেননি। তবে ইব্রাহিম খালেদের বক্তব্যে জানা যায়, 'আমরা (তদন্ত কমিটি) কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করিনি। সরকারেরও লুকানোর চেষ্টা না করাও ভালো। বরং এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে।' আমরাও আশা করব বিষয়টির সঠিক সুরাহা হবে। বিষয়টির সুষ্ট সমাধান হলে জনগণের মনে স্বস্তি আসবে আর তাদের আস্থাও বাড়বে।
লেখকঃ কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক: চাঁড়ুলিয়া |