 Moderator Forum Addict

Regist.: 01/09/2011 Topics: 31 Posts: 155
 OFFLINE | শেয়ারবাজার : এ যেন এক ভাঙা হাট
আবু আহমেদ
শেয়ারবাজারের পাইকারি ক্রেতারা এখন আর বাজারে নেই। তারা তাদের শেয়ারগুলোকে খুচরা ক্রেতাদের কাছে বেচে অনেক আগেই হাট ত্যাগ করেছেন। খুচরা ক্রেতারা এখন শেয়ার নিয়ে বড় বিপাকে আছেন। অপেক্ষা করছেন কখন পাইকারেরা আবার হাটে আসেন। কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষার সময় শেষ হওয়ার নয়। এখন হাট চলছে খুচরা ক্রেতা-বিক্রেতার কেনাবেচার মাধ্যমে। তাই তো ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের টার্নওভার বা লেনদেন ৫০০ থেকে ৬০০ কোটিতে নেমে এসেছে। আর পাইকারেরা যখন সক্রিয় ছিলেন তখন এই লেনদেন তিন হাজার কোটিতে উঠেছিল। পাইকারেরা একটা ধারণা দিয়েছিলেন যে, কোম্পানি যে মূল্যে শেয়ার ছাড়ুক না কেন, তারা আরো বেশি মূল্যে সেই শেয়ার কিনে নেবেন। আর সেই ধারণায় প্রভাবিত হয়ে ৩৩ লাখ খুচরা ক্রেতা ধারকর্জ করে এনে বেশি বেশি মূল্যে এই বাজার থেকে শেয়ার কিনতে লাগলেন। কিন্তু পাইকারদের টার্গেট ছিল ওই ৩৩ লাখ খুচরা বিনিয়োগকারী। তারা জানতেন এই অজানা-অজ্ঞান ৩৩ লাখকে যত দিন মুডে রাখা যাবে তত দিন তারা যেকোনো শেয়ার যেকোনো মূল্যে খাওয়াতে পারবেন। কিন্তু পাইকারেরা এটাও জানতেন, একদিন এদের মুড অফ হয়ে যাবে। তখন এরা মূল্য জিজ্ঞেস করতে থাকবেন, আর তখন শেয়ারবাজার নামের হাটটি ভাঙতে থাকবে। হাট ভাঙতে সময় লাগে। কিন্তু একটা ঝড়ের আভাস পেয়ে অতি তাড়াতাড়ি সবাই হাট ত্যাগ করতে চেষ্টা করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার ঝড়ে আক্রান্ত। ঝড়টা শুরু হয়েছে পাইকারি ক্রেতা বা কথিত বিনিয়োগকারীরা ছিটকে পড়ার কারণে। একজন পাইকারি ক্রেতা যে শেয়ার ধারণ করতেন, সেই শেয়ার এক হাজার খুচরা ক্রেতার পক্ষেও ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই শেয়ার নামের ওই মূল্যবান কাগজটির মূল্য খুব তাড়াতাড়ি বাড়তে লাগল। আজকে বাজার গড়ে এক-তৃতীয়াংশ মূল্য হারিয়েও আরো কারেকশন বা মূল্যবৃদ্ধির জন্য অপেক্ষা করছে। শেয়ারবাজারের সুদিনে অতি দরিদ্র কোম্পানির শেয়ার আয়ের অনুপাতে ৫০ গুণে বিক্রি হওয়া শুরু করল। এটা দেখে ওই সব কোম্পানির মালিকেরা তাদের ফ্যাক্টরিতে আরো শেয়ার উৎপাদন করা শুরু করলেন। উৎপাদনের প্রক্রিয়া হলো সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন, নতুন করে হিসাব সাজানো, তারপর রেগুলেটরের অনুমতি সাপেক্ষে হয় বোনাস শেয়ার ইস্যু করা, নতুন প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করা। এভাবে উদ্যোক্তা নামের পাইকারেরা লাখ লাখ নতুন শেয়ার বাজারে বেচলেন। ক্রেতা কারা? সেই ৩৩ লাখ খুচরা বা খুদে বিনিয়োগকারী। এখন তারা ওই সব শেয়ার নিয়ে বদহজমে ভুগছেন। বিক্রয় করলে আধামূল্য পাবেন, রাখলে অব্যাহত দরপতনের মুখে আরো লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। সেই সুদিনে অনেক মিউচুয়াল ফান্ডও বাজারে এলো। ওইগুলোও সম্পদের বা ঘঅঠ-এর তুলনায় ৭-৮ গুণে বিক্রয় হলো। আর অনেক ঘঅঠ ১০ টাকা, মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য হলো ৮ টাকা। এই হলো মূল্য সৃষ্টি ও মূল্য পতনের অতি সংক্ষিপ্ত কাহিনী।
মূল্যের অবিশ্বাস্য পতন আর খুচরা বিনিয়োগকারীদের জ্বালাও-পোড়াও দেখে সরকার একজন সিনিয়র ব্যাংকারের নেতৃত্বে একটা কমিটি করল ইস্যুগুলো বোঝার জন্য। তদন্ত কমিটি অতি অল্প সময়ের মধ্যে মোটামুটি একটা ভালো রিপোর্ট দিলো বটে, তবে আজকে দেখি ওই রিপোর্ট নিয়ে প্রচণ্ড টানাটানি। কমিটি যাদেরকে নিয়ম ভঙ্গের এবং অনৈতিকতার জন্য অভিযুক্ত করেছে, তারা পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে জনগণকে জানান দিচ্ছেন তারা দায়ী নন, গলদ অন্যখানে। সেটাই তো স্বাভাবিক, বিশেষ করে সরকার যখন দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে যে, বিষয়টি নিয়ে কোন দিকে এগোবে। এসব দেখে খুচরা ক্রেতারা আরো হতাশ। তারা বুঝে নিতে শুরু করেছেন এই হাটকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসবেন না। ঝড়ে সব উড়িয়ে নিয়ে গেলে যারা ইতিপূর্বে হাট ত্যাগ করেছেন, তারা বলবেন সবই কিসমত বা নিয়তি। নইলে তারা ঝড় থেকে রক্ষা পেলেন, কিন্তু অত বাতি জ্বালিয়ে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এখনো বসে আছেন তারা কেন বুঝতে পারলেন না। শেয়ারবাজার নামের হাটটিতে লোকজন জড়ো হতেন শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করতে। যারা শেয়ারের পাইকারি বিক্রেতা, যেমন শিল্পের উদ্যোক্তারা; তারা বাজার তেজি থাকলে কোটি কোটি টাকা শিল্প ও ব্যবসায় করার নামে তুলে নিতে পারতেন। আজকে অনেক পাইকারি শেয়ার বিক্রেতা বা সঠিক উদ্যোক্তা শেয়ারবাজার থেকে অর্থ নেয়ার পর সেই অর্থকে সঠিকভাবে ওই নির্দিষ্ট শিল্পে খাটাননি। এই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে অন্য কাজে। তাই তাদের কোম্পানিগুলো জেড গ্রুপ হয়ে এখন রেগুলেটরের হুকুম অনুযায়ী *** মার্কেটে। এর অর্থ হলো, যারা অতি আশা নিয়ে ওই সব শেয়ার আইপিও বাজারের বা পরে স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কিনেছেন সেগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় শূন্য। কিন্তু এসব দাগাবাজি নিয়ে রেগুলেটর সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) কোনো গরজ নেই। অথচ এসব ত গ্রুপের এবং *** মার্কেটে কোম্পানিগুলোকে শেয়ার ছাড়ার অনুমতি দিয়েছিল এসইসি নামের অতি ক্ষমতাশালী সেই কমিশন। শেয়ারবাজারের পাইকার হলেন উদ্যোক্তারা, ব্যাংকগুলো, লিজিং কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড এবং সেই সাথে ব্যক্তিপর্যায়ের কিছু জুয়াড়ি। তারা বেঁচে গেছেন, মরতে বসেছেন সেই ৩৩ লাখ। তাদের কে বাঁচাবে?
লেখক : অর্থনীতিবিদ
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৬/০৪/১১] |