 Moderator Forum Addict

Regist.: 01/09/2011 Topics: 31 Posts: 155
 OFFLINE | শেয়ারবাজারে নির্বোধ তত্ত্বের দিন শেষ!
আবু আহমেদ
শেয়ারবাজার কোনো কারণ ছাড়াই যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে তখন যে কেউ যে শেয়ারই কিনুক না কেন কাগজে-কলমে লাভ করতে থাকে। আর এই লাভের কথা শুনে চারদিক থেকে আরো লোক ক্রেতার বাজারে শামিল হতে থাকে। তখন শেয়ারের হাতবদল যেমন বেড়ে যায়, তেমনি যে শেয়ারটি লাভ করে বিক্রি করেছে বলে মনে করেছে সে সেই শেয়ারটি অথবা উচ্চমূল্যে অন্য শেয়ারগুলো আবার কিনে নেয়। এভাবে কেনার একটি চক্র চলতে থাকে এবং প্রতিবারই বেশি মূল্যে। এর মূল কারণ হলো, নতুন ক্রেতা এবং সেই সঙ্গে নতুন অর্থের প্রবেশ। এ অবস্থায় শেয়ার সরবরাহ অবশ্যই পিছিয়ে পড়বে। অবস্থার সুযোগ নিয়ে সুচতুর উদ্যোক্তারা তাঁদের পুরনো শেয়ারকে অতিমূল্যায়ন করে বাজারে বিক্রি করে দেবেন।
অন্য নানাবিধ আশার কথা বলে অতিমূল্যে প্রাইমারি শেয়ার বা আইপিও বিক্রি করতে এগিয়ে আসবেন। যুক্তিহীন শেয়ারবাজার বৃদ্ধির বিরুদ্ধে রেগুলেটরি এসইসির একটি বাধার অবস্থান নেওয়ার কথা। কিন্তু সত্য হলো, দুর্বল এসইসি এই সময়ে সুচতুর বড় শেয়ার বিক্রেতাদের পক্ষ নেয়। তাতে মনে হবে সব কিছুই ঠিকমতো যাচ্ছে এবং শেয়ারবাজারের শনৈঃ শনৈঃ অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। এ অবস্থায় এও শোনা যায়, নিরাপদ হলো নাকি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। কিন্তু উল্লম্ফিত বাজারে মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলোও যে অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে, সে কথা কে বলবে। যতক্ষণ পর্যন্ত একটানা শেয়ারবাজার বাড়তে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত সবাই হাসিখুশি থাকে। বাজারের আশপাশের মিষ্টির দোকানগুলো মিষ্টিশূন্য হয়ে পড়ে। কারণ এত লাভ থেকে কেউ না কেউ প্রতিদিন মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। একই অবস্থা হোটেলগুলোতেও। শেয়ারবাজার ভাঙার আগে-পরে ভালো খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আর এ পর্যায়ে বাজারে তেমন বিনিয়োগকারী থাকেন না। তাঁরা হয়ে পড়েন শেয়ার ব্যবসায়ী।
অধিকাংশ লোক যখন নিজেকে বিনিয়োগকারী না বলে শেয়ার ব্যবসায়ী বলবেন, তখন বুঝতে হবে শেয়ারবাজারে ঈশান কোণে কালো মেঘ জমছে। এ পর্যায়ে শেয়ার কেনার জন্য ঋণ বিক্রি করার ধুম পড়ে যাবে। কি মূল্যে ঋণ কেনা হচ্ছে সেদিকটার খেয়াল ঋণ ক্রেতারা রাখবেন। মূল্য যা-ই হোক, ঋণ পেলেই হলো! আর ঋণ বিক্রেতা ব্যাংকগুলো অতি খুশিতে ঋণের ডালা খুলে বসে, আর শুধু আহ্বান জানায় ঋণ কেনার জন্য। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় হুড়োহুড়ির শেয়ারবাজারে মোট যে অর্থ খাটানো হচ্ছে তার ৭০-৮০ শতাংশ ঋণের টাকা। যারা ঋণ করে অতিমূল্যের শেয়ারগুলোকে কিনছে তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলবে, তারা তো শেয়ারগুলো ধারণ করবে না, চার দিন, বড়জোর এক সপ্তাহ পর তো ওইগুলো বিক্রি করে দেবে।
যখন জিজ্ঞেস করা হয় ওগুলো কিনবে কে, তখন তারা বলে, ওরা, যারা বাজারে নতুন এসেছে এবং নতুন করে ঋণ করা শুরু করেছে। অর্থাৎ এর অর্থ হলো, যত দিন নতুন ক্রেতা এবং নতুন অর্থ এই বাজারে প্রবেশ করতে থাকবে তত দিনই শেয়ারের মূল্য বাড়তে থাকবে, তত দিনই নির্বোধ তত্ত্ব কাজ করতে থাকবে। নির্বোধ তত্ত্ব হলো নিজেকে চালাক মনে করা, অন্যদের বোকা ভাবা। আমাদের শেয়ারবাজারে ২০০৯ এবং ২০১০-এ যাঁদেরই জিজ্ঞেস করা হতো, ভাই, আপনি এই মূল্যে এই শেয়ারগুলো কিনছেন কেন? উত্তর আসত, ধুর ভাই, আমি কি শেয়ারগুলো রাখব, আমি তো শুধু চার দিনের অপেক্ষায় আছি। কিন্তু এ প্রক্রিয়া যে বেশি দিন চলতে পারে না, তা নতুন বিনিয়োগকারীরা সহজে বুঝবেন না। তাঁরা বুঝে ওঠার আগেই সুচতুর উদ্যোক্তা এবং বড় খেলোয়াড়রা কাম বানিয়ে সাইডলাইনে চলে যান। তারপর শেয়ারবাজার যেখানে আসার সেখানে আসতে থাকে। আসার পথে অনেক ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রকাশ হতে থাকে। ক্ষোভের আগুন একটু প্রশমিত করার জন্য সরকার ও রেগুলেটরি কমিশন কিছু প্রণোদনা নিয়ে এগিয়ে আসে। কিন্তু কোনো প্রণোদনাই যেন কাজ করতে চায় না।
একটা ভয়ভীতির পরিবেশ শেয়ারবাজারকে পেয়ে বসে। আস্তে আস্তে আশাবাদী বিনিয়োগকারীরাও নিস্তেজ হয়ে যান। শেয়ারবাজার পড়ে যেখানে থাকার কথা তারও নিচে পড়ে যায়। বলা হতে থাকে, শেয়ারবাজারে ক্রাশ চলছে। কিন্তু ততক্ষণে নির্বোধদের অর্থ অর্ধেক হয়ে গেছে। ঋণের টাকা ফেরত দিতে গিয়ে প্রিয় শেয়ারগুলোকে পানির মূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে। চারদিকে একটা হৈচৈ পড়ে যায়, কী হলো, কেন হলো_বলে। রেগুলেটর এবং সরকার উঠেপড়ে লাগে চোর ধরার জন্য। কিন্তু ততক্ষণে চোর অনেক দূর চলে গেছে! শেষ পর্যন্ত দেখা যায় চোরে চুরি করেছে সবার সামনে এবং কথিত আইন মেনে। তারপর শুরু হয় নিয়মকানুন টাইট করার পালা। ত্রুটি খোঁজার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি কাগজপত্র ঘেঁটে অনেক সুপারিশ পেশ করে। তাদের দেওয়া সুপারিশগুলো থেকে যৎসামান্য সরকার বাস্তবায়ন করে, তাও অনেক সময় লাগিয়ে। ততক্ষণে সুনামির কথা অনেকে ভুলে যায়। যেমন ভুলে গেছে ১৯৯৬-এর কথা। তবুও ভালো এ জন্যই যে, প্রত্যেক সুনামির পর অন্তত কিছু সংস্কার আসে। এবার আমরা চেয়ে থাকলাম কী কী সংস্কার আসে সেদিকে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় |