ভাল্লুকের বিদায়, ষাঁড়ের আগমন ও আমাদের করণীয়।
===============================
অবশেষে বহু প্রতীক্ষিত ষাঁড়ের আগমনের সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর বহু দিনের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে। এবার ভাল্লুকের বিদায় নেবার পালা। কত কিছুই না করতে হয়েছে এই ভাল্লুক তাড়ানোর জন্য। ডিএসই বিল্ডিং এ মূহুর্মুহু ঢিল পাটকেল ছোঁড়া, রাস্তা অবরোধ করে টায়ার জ্বালানো, বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ, প্রতীকি ভিক্ষা কর্মসূচী পালন, মিলাদ মাহফিল ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার হাঁফ ছেড়ে নতুন উদ্যমে আবার শুরু করা। হ্যাঁ, আমি শেয়ারবাজারে টানা পতনের শেষে বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর কথা বলছি।
আমার কাছে প্রতিদিন অনেক মেইল, মেসেজ আসে, শেয়ারবাজারের এই পতন কবে থামবে জানার জন্য। অনেক হৃদয় বিদারক মেসেজও পাই। বাবার পেনশনের জমানো সব টাকা বিনিয়োগ করে আজ দুই তৃতীয়াংশ পূঁজি হারিয়ে বসেছেন, কেউ কেউ শেষ বয়সে কিছু লাভের আশায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্ব খুইয়ে বসেছেন। কারো কারো পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। শেয়ারবাজারে সব হারিয়ে আজ পথে বসার উপক্রম। কেউ কেউ ফোর্স সেলের খড়গে পড়ে সব তো হারিয়েছেনই, বরং আরো কিছু ঋণের বোঝা মাথায় চাপিয়েছেন। সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তারা, যারা গত সেপ্টেম্বর বা এর পরে শেয়ারবাজারে এসেছেন। যা হোক, পুরনো দিনের সব গ্লানি মুছে আসুন আবার নতুনভাবে শুরু করি।
আলু পটলের ব্যবসার সাথে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের কিছুটা মৌলিক পার্থক্য আছে। আলু পটলের দাম বছরের একটা সময়ে বাড়ে, শেয়ারবাজারে একবার নয়, দশবার, বিশবার কিংবা আরো বেশী লাভের মওকা আসতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন কিছুটা কৌশলী হওয়া। তা না হলে লাভের অংক শুধু ক্যালকুলেটরেই থেকে যাবে। আবার ঝুঁকি ও আছে। অদৃশ্য অনেক বিপদ আছে প্রতি পদে পদে। তাই এখানে পা ফেলতে হবে খুব সাবধানে। একটু এদিক ওদিক হলেই সমূহ বিপদের আশংকা। জলে নেমে কুমীরের সাথে লড়তে হলে তো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতেই হবে!!!
বাজার কি আসলেই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ?
=====================
আমরা যারা টেকনিক্যাল এনালাইসিস এর উপর নির্ভর করি তারা শেয়ারবাজার সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে খুব সাবধানী এবং সতর্ক মন্তব্য করে থাকি। দুটি কারণে- (১) টেকনিক্যাল এনালাইসিস সম্পর্কে যেন কেউ ভুল ধারণা পোষণ না করেন , (২) নিজের টেকনিক্যাল এনালাইসিস করার ক্ষমতা সম্পর্কে কেউ যেন সন্দেহ পোষণ না করেন। টেকনিক্যাল এনালিস্টরা গুজবের পিছনে ছুটেন না, কারণ তারা জানেন গুজবের ফলাফল টেকনিক্যাল এনালাইসিস এ ধরা পড়তে বাধ্য। তারা গুজবের বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে শুনেন, তারপর বিশ্লেষণ করেন, মিলে গেলে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেন না। এই ফোরামে প্রতি ট্রেডিং ডে এর আগে বাজার পুর্বাভাস দেওয়া হয়। সব সময় মেলে না। টেকনিক্যাল এনালাইসিস এর উপর নির্ভর করে ১০০% নির্ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। আবার একই ডাটার উপর ভিত্তি করে দুইজন এনালিস্ট এর সিদ্ধান্ত ভিন্ন ও হতে পারে।তবে যারা নিয়মিত পূর্বাভাস দেখেন, তারা একটা বিষয় নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, যখন বাজার উলটা স্রোতে হাঁটতে শুরু করে সেই সময়ের পূর্বাভাস গড়বড় হয়ে যায়। ২, ৩ ও ৬ মার্চের বাজার পূর্বাভাসে যা বলেছিলাম তার উলটো ঘটেছে। এটা আসলে Trend Reversal এর ইঙ্গিত দেয়। বাজার সম্পর্কে শতভাগ নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয় বলেই, টেকনিক্যাল এনালিস্টরা এ সম্পর্কে জোরালো মন্তব্য করতে চান না। সম্ভবতঃ আমিই প্রথম সাহস করে এরূপ পূর্বাভাস দিয়ে যাচ্ছি। বাজার পুরোপুরি Bullish Trend এ আসবে কিনা তা জানতে হলে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে এবং কিছু বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে। আমি জানি ৬৩০০ এর উপরে না উঠলে কোন এনালিস্টই বাজার সম্পর্কে Positive মন্তব্য করার ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ সতর্কতা অবলম্বন করবেন। তবুও আরো একবার সাহস করেই বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর আগাম পূর্বাভাস দিলাম।
বাজার ঘুরে দাঁড়াবে কিনা তা জানার একটা স্বীকৃত পদ্ধতি হল W Test. গত ২০ ফেব্রুয়ারী থেকে আজ পর্যন্ত সূচকের ক্যান্ডেলস্টিক চার্ট দেখলে আমরা W Formation এর একটি আভাস পাই। নিচের চার্টটি দেখুনঃ
১ম সাদা ক্যাল্ডেলস্টিকটি ২০ ফেব্রুয়ারীর, পরবর্তী ৫ টি কালো ক্যান্ডেলস্টিক যথাক্রমে ২২,২৩,২৪, ২৭ ও ২৮ ফেব্রুয়ারীর, এর পরবর্তী ১ টি সাদা, ১ টি কালো ও ২ টি সাদা ক্যান্ডেলস্টিক যথাক্রমে ১,২,৩ ও ৬ মার্চের। এই ১০টি ক্যান্ডেলস্টিক এর ক্লোজিং প্রাইস এর সাহায্যে চার্টের মত একটি W পাওয়া যাচ্ছে। তবে পুরোপুরি Confirmation এর জন্য ইন্ডেক্সকে ৬৩০০ এর বাধা পার হতে হবে।
আজকের বাজারের লেনদেন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে শেষ দেড় ঘন্টায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শেয়ারের লেনদেন হয়েছে, যা মোট লেনদেনের (৫৬৫ কোটি) শতকরা ৫৩ ভাগ। দুপুর ১:৪০ এর পর সূচক বড় জাম্প দেওয়ার পর আমার মনে হল, কি এমন হয়েছে যে মিনিটে গড়ে ১ কোটি টাকার লেনদেন থেকে এক লাফে তিনগুন বেড়ে গেল? আরো ৫ মিনিট অপেক্ষা করলাম, সুচক আরেকটু বাড়ল, লেনদেন গড়ে প্রতি মিনিটে ৩ কোটি টাকাই হচ্ছে। Bull Indication এর সংকেত পাওয়া গেলো। বেশ কিছু শেয়ার কিনলাম। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম সরকার পূর্বঘোষিত ৫০০০ কোটি টাকার সমন্বিত তহবিল গঠন করেছেন। যার কারণেই বাজারে আকস্মিক তেজীভাব।
সূচক কত পর্যন্ত যেতে পারে?
==================
গত ডিসেম্বরে সুচক ৯০০০ স্পর্শ করেছিল। এ পর্যায়ে যেতে কমপক্ষে ১ বছর বা তার বেশী সময় লাগতে পারে। আমার হিসেবে
আপাততঃ ৫৪০০ থেকে ৬৬০০ এর মধ্যে সূচক উঠানামা করতে পারে। আইসিবি ও সাধারণ বীমা যে বিনিয়োগ করেছে তারা তাদের বিনিয়োগ থেকে লাভ তুলতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। আইসিবি যে শেয়ার কিনেছে তাতে তাদের গড় ক্রয়মূল্য ৬০০০ ইন্ডেক্স এর দামের সমান হবে।
ওয়াকা ওয়াকা বুম বুমঃ
===============
ফেসবুক এর বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ এ বাজার উঠতে থাকলে অমুক শেয়ার ওয়াকা ওয়াকা বুম বুম জাতীয় কথাবার্তা দেখা যায়। ওয়াকা ওয়াকা বুম বুম এর সময় এখনো আসেনি। এসব ওয়াকা ওয়াকার সত্যাসত্য যাচাই করে বিনিয়োগ করাই ভালো।
সূচক এক লাফে ৯০০০ পর্যন্ত যাবে না- এটা অবধারিত। গত ১৯ জানুয়ারীর পতনের পর ফোরামে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। ওখানে বলেছিলাম সূচক সারা বছর ৫৬০০-৬৩০০ এর মধ্যে থাকবে। বর্তমান বাস্তবতায় এটা প্রায় সত্য হতে চলেছে।
আজকের (০৬-০৩-২০১১) বাজার পর্যবেক্ষণঃ
===========================
আজকের বাজার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় নিচের শেয়ারগুলো সার্কিট ব্রেকারের উচ্চ সীমা স্পর্শ করেছেঃ
১। অগ্রণী ইন্স্যুরেন্স
২। ডেল্টাস্পিন
৩। দেশবন্ধু পলিমার
৪। দুলামিয়া কটন
৫। ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স
৬। ফাইন ফুডস
৭। ফু-ওয়াং সিরামিকস
৮। আইএলএফএসএল
৯। ম্যাকসন স্পিন
১০। মালেকস্পিন
১১। মেঘনা কন্ডেন্সড মিল্ক
১২। মেঘনা পেট
১৩। মেট্রোস্পিন
১৪। নিটল ইন্স্যুরেন্স
১৫। নর্দার্ণ ইন্স্যুরেন্স
১৬। প্রাইম ফিন্যান্স
১৭। প্রাইম ইন্স্যুরেন্স
১৮। প্রাইম টেক্সটাইল
১৯। কাশেম ড্রাইসেল
২০। রহিমা ফুড
২১। রেনউইক যজ্ঞেশ্বর
২২। আরএন স্পিন
২৩। সফকো স্পিন
২৪। সন্ধানী ইন্স্যুরেন্স
২৫। সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স
২৬। শাইনপুকুর সিরামিকস
২৭। তাল্লু স্পিন
উপরোক্ত শেয়ারগুলোর মধ্যে অনেক দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ার রয়েছে। সমন্বিত তহবিল গঠণের খবর পাওয়া গেছে। এই টাকা বাজারে আসতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। তবে একইসাথে আশা ও হতাশার কথা হল গ্যাম্বলাররা এতদিন চুপ করে তামাশা দেখলেও এখন বিনিয়োগ করতে শুরু করেছে। আর গ্যাম্বলার দের পছন্দ হচ্ছে দুর্বল মৌলভিত্তির, জেড ক্যাটাগরীর এবং কম পেইড আপ ক্যাপিটাল এর শেয়ার। এদের ফাঁদে পা না দেওয়াই ভালো।
কোন শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন?
====================
অবশ্যই ভালো মৌলভিত্তির শেয়ার। মনে রাখবেন, এতদিন যাদেরকে হাতে পায়ে ধরে বিনিয়োগ করানো যায়নি, এখন তারাই বিনিয়োগের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে। ব্রোকার হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং সরকারের সমন্বিত তহবিল একসাথে বিনিয়োগ শুরু করলে তার প্রভাব বাজারে পড়তে বাধ্য। তাই ভালো ফান্ডামেন্টালের শেয়ার কেনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ভালো কিছু শেয়ার এখনো শায়েস্তা খানের আমলের দামে বিক্রি হচ্ছে। এই শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগ হবে সবচেয়ে নিরাপদ এবং লাভজনক।
বিনিয়োগ বিভাজনঃ
=============
স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী - এই তিন ধরণের বিনিয়োগ আপনার বিনিয়োগের উত্তম পন্থা হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী শেয়ার নির্বাচনের ক্ষেত্রে কম পিই সম্পন্ন শেয়ার নির্বাচন করাই ভালো।
পিই ১০ এর নিচে আছে এমন শেয়ারে বিনিয়োগ লাভজনক হতে পারে। একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, অনেকে মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে শেয়ার ভেবে ভুল করেন এবং কম পিই দেখে বিনিয়োগ করেন, কিন্তু প্রত্যাশিত লাভ পান না। মিউচ্যুয়াল ফান্ড এ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে সব ফান্ড এর বাজার মূল্য তাদের নেট এসেট ভ্যালু এর কম বা নেট এসেট ভ্যালুর কাছাকাছি আছে সেগুলোতে বিনিয়োগ করতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং কর্পোরেট বন্ড ভালো হতে পারে। মধ্যমেয়াদী শেয়ার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সহসা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারে এবং ভালো মৌলভিত্তির সেগুলো নির্বাচন করা উচিত। স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য ভালো মৌলভিত্তির যে সব শেয়ার গত একমাসে দামের ঊর্ধমূখী প্রবনতা দেখিয়েছে , একইসাথে ভালো ভলিউমে লেনদেন হয়েছে সে সব শেয়ার নির্বাচন করতে পারেন। ৩ দিন থেকে ১ মাস স্বল্পমেয়াদী, ১ মাস থেকে ৬ মাস মধ্যমেয়াদী এবং ৬ মাসের বেশী সময়কে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে ধরে নিতে পারেন।
ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১০ এর নিচে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ইন্স্যুরেন্স ক্ষেত্রে ২০ এর নিচে এবং অন্যান্য সেক্টরের ক্ষেত্রে ১৫ এর নিচে পিই আছে এমন শেয়ার নির্বাচন ভালো হতে পারে। ৩/৪ সেক্টরের ৫/৬ টির বেশী শেয়ার নির্বাচন না করাই ভালো।
মানি ম্যানেজমেন্ট
============
অন্তত এক তৃতীয়াংশ টাকা হাতে রাখা ভালো, যাতে কোন শেয়ারের দাম কমলে এভারেজ করে নিতে পারেন।