 Moderator Forum Addict

Regist.: 01/09/2011 Topics: 31 Posts: 155
 OFFLINE | হাঁটুভাঙা শেয়ারবাজার
আবু আহমেদ
অনেকেই ধারণা করেছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান আইসিবি যখন ৫০০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ডের কথা ঘোষণা করেছে, তখন শেয়ারবাজার ধার পড়বে না। কিন্তু সেটা যে হবে না, তা তো শেয়ারবাজারের পরবর্তী পতনগুলো থেকেই বোঝা গেল। আসলে কোন ফান্ড কোন শেয়ারবাজারকে এক জায়গায় আটকে রাখতে পারে না, যদি সেই শেয়ারবাজারের পক্ষে আস্থা ও সময় কাজ না করে। শেয়ারবাজারের পক্ষে এখন সময় কাজ করছে না, হয়তো অনেকদিন ধরেও কাজ করবে না। যেভাবে দলে দলে লোক শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছে, সেভাবে দলে দলে লোক শেয়ারবাজার থেকে বের হয়ে গেছে। অন্যদিকে বৃহৎ বিনিয়োগকারীরা নানা কারণে এখন কোন রকম নতুন অর্থ না খাটিয়ে বসে আছে। তারা যদি বাজারে সক্রিয় না হয়, তাহলে বাজার স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে পাবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় অর্থনীতির একটা সাধারণ সমাধান হল বাজার আরও পড়বে, পড়ে এক পর্যায়ে আস্তে আস্তে উঠতে থাকবে। তবে সে পড়া কতটা পড়া, তা কেউ বলতে পারে না। বড় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আছে সামান্য কিছু ব্যক্তি ও ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যাংক ২০০৯ ও ২০১০-এ এই বাজারে অনেক বিনিয়োগ করেছিল, যা ২০১১-তে তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে।
এটার মূল কারণ হল তারল্য সংকট এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঘন ঘন বকা খাওয়া। অত হুশিয়ারির মধ্যে কোন ব্যাংকই আগের মতো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ দেখাচ্ছে না। তারা তাদের ঋণ বিক্রির কাজটি মার্চেন্ট ব্যাংক শাখার মাধ্যমে চালু রাখবে সত্য, তবে আগের মতো ঋণ ক্রেতা পাবে না। বড়রা একরকম বসে গেলে ছোট বিনিয়োগকারীরা ময়দান ত্যাগ করতে বাধ্য। অন্যদিকে তদন্ত রিপোর্ট দেয়ার পর শেয়ারবাজারকে ঘিরে আর একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটা হল- দেখা যাক কী হয়। সব মিলিয়ে অপেক্ষার লোক বেশি এবং বিনিয়োগে ঝুঁকি নেয়ার লোক কমে গেছে। ইতিমধ্যে যে দুটো আইপিও লিস্টিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছে, সে দুটো কোম্পানিকে ডিএসই এবং সিএসই লিস্টিং দিতে পারেনি। রেগুলেটর এসইসি নিজেও এ দুটি কোম্পানির ক্ষেত্রে কোন হুকুম জারি করতে পারেনি। সামনের আইপিওগুলো নিয়ে অনেকে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আছে। ইতিহাস বলে, মন্দার বাজারে আইপিওগুলোকে কথিত ন্যায্যমূল্যেও বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেকেন্ডারি বাজার প্রায় অচল হয়ে পড়ে থাকলে প্রাইমারি তথা আইপিও বাজারেও দুর্ভিক্ষ যাবে, এটাই স্বাভাবিক। এর অর্থ হল শেয়ারবাজারকে ঘিরে পুঁজি উত্তোলনের যে একটা সুযোগ এসেছিল, সেটা প্রায় বরবাদ হয়ে যেতে পারে। সরকার কিছু আশংকার ব্যাপারে পূর্বাহ্নে আঁচ করে যদি ৫০০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ড গঠন করার নির্দেশ দেয়, তাহলে তাকে ধন্যবাদ। সেই ফান্ড অনেক কাজ দেবে বলে আমার মতো লোক মনে করে। সেই ফান্ডের অর্থ যে শুধু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হবে, এমন কোন কথা নেই। সেতুঋণ প্রদানসহ বিদেশীদের সঙ্গে এবং স্বদেশী ব্যক্তি খাতের প্রজেক্টে এই ফান্ড থেকে শেয়ার কেনা তথা ইক্যুইটি পার্টিসিপেশনে যাওয়া যাবে। আর এই ফান্ড বাজারের কোন স্তরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হবে এটা সম্পূর্ণরূপেই সেই আইসিবি’র ওপর নির্ভর করবে।
মনে রাখতে হবে, এই ফান্ড ব্যবহার করে আইসিবিকে লাভ করতে হবে এবং কমপক্ষে ব্যাংক সুদের চেয়ে বেশি মুনাফা এই ফান্ডের গ্রাহকদের প্রদান করতে হবে। এই ফান্ডে অর্থ জোগানোর বিষয়টি কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে অর্থ দেবে, তারপর যদি আরও দরকার পড়ে তাহলে সেটা জনগণ থেকে নেয়া যেতে পারে। ৫০০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ড নিয়ে আইএমএফ ইতিমধ্যে বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে। শুনেছি, বিভিন্ন বৈঠকেও তারা সরকারি উদ্যোগে এই ফান্ড গঠনের বিরোধিতা করেছে। তাদের কাজই হল বিরোধিতা করা, বিশেষ করে সরকারি অর্থ যেখানে ব্যয় হবে। এই ক্ষেত্রে তারা যুক্তি মানতে চাইবে না। সব অনুন্নত দেশে গিয়েই তারা একই বাক্যে প্রায় একই অনুশাসন জারি করতে চেষ্টা করে। আমাদের অর্থনীতিতেও তারা টাইট বা সংকোচনশীল মুদ্রানীতির প্রবক্তা। সেই মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে গিয়ে আজকে বাজারে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং আমানত ও ঋণের সুদের হার বেড়ে গেছে। সামগ্রিক বিচারে এই নীতি অর্থনীতির স্বার্থের বিপক্ষেই যাবে। এই নীতি শেয়ারবাজারের স্বার্থেরও বিপক্ষে। ১৪% সুদে যেখানে ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করছে, সেখানে শেয়ারবাজার থেকে শেয়ার কিনে কে কত পাবে? মুনাফার হার বলতে একটা কথা আছে। এই হার তখনই বাড়বে লোকজন যদি সস্তায় শেয়ার কিনতে পারে। আর সে জন্যই এখন লোকে কম-এ শেয়ার কিনতে চাইবে। যতদিন শেয়ারবাজার রমরমা ছিল, ততদিন কেউ হিসাবগুলো ঠিকমতো করেনি। এখন তাদের করতে হচ্ছে এ জন্যই যে, তারা সুদের একটি প্রতিযোগী মুনাফা এই বাজার থেকে পেতে চায়। তদন্ত কমিটি বলেছে, বাজার থেকে অনেক টাকা কারসাজির মাধ্যমে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু আরও সত্য হল, আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা অর্থনীতির অতি সাধারণ নিয়ম মেনে ইতিমধ্যে এই বাজার ত্যাগ করেছে। এ অবস্থায় সরকার থেকে সার্বিক সমর্থন ছাড়া এই বাজারে অবশিষ্ট আস্থাটুকুও ধরে রাখা মুশকিল হবে।
আবু আহমেদ : অর্থনীতিবিদ
[সূত্রঃ যুগান্তর, ১৮/০৪/১১] |