 Moderator Forum Addict

Regist.: 01/09/2011 Topics: 31 Posts: 155
 OFFLINE | শেয়ারবাজারে জোয়ার-ভাটা
আবু আহমেদ
আমাদের শেয়ারবাজার পড়ে যাওয়ার কারণে চার দিকে হইচই সৃষ্টি হয়েছে। হইচই না হলে বাজার যে অনেক উঁচুতে গিয়ে অনেক নিচুতে পড়ে গেছে, সেটা কেউ বুঝত না। হইচইয়ের কারণেই সরকার স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। অন্যান্য দেশেও শেয়ারবাজার পড়ে যায়, তবে হইচইটা কোথাও কোথাও আমাদের তুলনায় কম হয়ে থাকে। শেয়ারবাজার কখনো ধপাস করে পড়ে, কখন বা আস্তে পড়ে। ধপাস করে অনেক পড়ে গেলে আমরা বলি ‘ক্রাশ’, আর আস্তে পড়লে বলি ‘কারেকশন’ বা সংশোধন। আমাদের শেয়ারবাজার ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে ও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কয়েকবার ক্রাশ করেছে। ক্রাশ করার পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের প্রচণ্ড বিক্ষোভের মুখে শেয়ারবাজার বন্ধ করাসহ ট্রেডিং সময়কে ছোট করা হয়েছে। সবই করা হয়েছে ধস ঠেকানোর কথা বলে এবং পর্যালোচনার নামে। শেয়ারবাজার যে পড়ে যাবে, তার ইঙ্গিত নভেম্বর মাস থেকে বাজার নিজেই দিচ্ছিল। শেয়ারবাজার চলে আস্খায়। শেষ পর্যন্ত কয়েকটি বড় রকমের কারেকশন বা পরিশুদ্ধি হওয়ার পর আস্খায় যখন চিড় ধরল, তখন বাজার ক্রাশের গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল। শেয়ারবাজার সম্বন্ধে কতগুলো সত্যবচন আছে। সেগুলোর কয়েকটি হলো, বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী হয় তখন সবাই ফুরফুরে মেজাজে থাকে, আর পড়ে গেলে সবারই মনটা খারাপ হয়ে যায়। যে বাজার অতি সহজে ওঠে সে বাজার অতি সহজে পড়েও যায়।
আমাদের বাজারটা ২০০৯ ও ২০১০ সালে অতি সহজে ওপরে উঠেছিল। শেয়ারবাজারকে ওপরে উঠানোর জন্য সব সময়ই নিত্যনতুন কলাকৌশল আবিষ্কৃত হতে থাকে। যেমন ১৯৯৬-এর পর আমাদের শেয়ার-বাজারকে দুই বছর ধরে উঠানোর জন্য চাহিদার একটা বিস্ফোরণ তৈরি করা হয়েছিল। বাজারে যারা গত কয়েক বছরে প্রবেশ করেছে, তারা ১৯৯৬ দেখেননি কিংবা অন্য দেশের শেয়ারবাজারের ক্রাশ করার ইতিহাসও জানেন না। তাদের কাছে শেয়ারে টাকা খাটানো বিনিয়োগ না হয়ে শেয়ারব্যবসা হিসেবে ধরা দিয়েছে। যে বাজারে শেয়ার বিনিয়োগ রাতারাতি শেয়ারব্যবসায় রূপান্তর হয়ে যায়, সে বাজার অবশ্যই অতি সহজে উঠবে এবং এই ওঠার পরিণতিই হলো ধস। আমাদের শেয়ারবাজার চলে গেছে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে। এই বাজার অর্থের জোগানে সয়লাব হয়ে গেল, কিন্তু তার বিপরীতে শেয়ার সরবরাহ ছিল কম। আর ওই সুযোগে অনেক দুর্বল শেয়ার আকাশচুম্বী মূল্যে বিক্রয় হতে থাকল।
অন্য দিকে নতুন করে অতি উঁচু প্রিমিয়ামে শেয়ারবাজার মাত করার জন্য একশ্রেণীর উদ্যোক্তা ক্রমে ক্রমে রোডশোর প্রস্তুতি নিতে লাগল। রোডশোর ওই সব দৌড় দেখে সচেতন বিনিয়োগকারীদের এক অংশ আতঙ্ক অনুভব করলেন। এই সব বিনিয়োগকারী এটাও ভাবলেন তাদের স্বার্থকে রক্ষা করতে যে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বা এসইসি গঠন করা হয়েছে, ওই এসইসি শেষ পর্যন্ত রোড-শোওয়ালাদের পক্ষেই থাকবে। কাগজে-কলমে কোম্পানি তৈরি করে শেয়ার বেচায় নেমে পড়ল অনেকে। আর তাদের ইচ্ছার কাছেই নতি স্বীকার করতে লাগল এসইসি নামের রেগুলেটর। বিগত নভেম্বরের দিকে ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজার থেকে সরে গেল। তবে শেয়ারের বিপরীতে ঋণ বেচা চলতে থাকে। ওই ঋণের অর্থে শেয়ারগুলো কিনে নিলেন অতি আশাবাদী নতুন বিনিয়োগকারীরা। শেষ পর্যন্ত এই সব বিনিয়োগকারী বুঝতে পারলেন তাদের হাতে অনেক বেশি শেয়ার এসে গেছে। অথচ এসব শেয়ারের অন্য ক্রেতা নেই।
এক দিকে সুদ গোনা, অন্য দিকে মূল্যপতন। এ অবস্খায় চক্রটি শুধু কেন্দ্রের দিকেই যেতে লাগল। শেয়ারবাজার সম্বন্ধে অন্য দুটো সত্য হলো, অতি মূল্যায়ন আর কেলেঙ্কারির বিষয়গুলো ঘটে শেয়ারবাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী থাকে। আর শেয়ারবাজার ক্রাশ করলে তখন ব্লেইম গেইম (দলথশপ বথশপ) দোষারোপ শুরু হয়ে যায়। তখনই শুরু হয় চোর ধরো, নীতি বদলাও, প্রতিষ্ঠান গড়ো। কিন্তু ধসের আগে এসব নিয়ে কথা বললে নীতি-নির্ধারকেরা কানে তুলো দিয়ে বসে থাকেন। আমাদের এই বাজারে আজতক যে সংস্কারগুলো হয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগ হয়েছে ১৯৯৬-এর ক্রাশের কারণে। অন্য দেশেও বড় বড় অর্থনৈতিক সংস্কার এসেছে শেয়ার এবং আর্থিক বাজার ক্রাশের কারণে। তার পরও যে কেলেঙ্কারি আর ক্রাশ ঘটবে না, এমন নয়। মানুষ পুরনো নিয়ম ও পদ্ধতিকে পরাজিত করার জন্য নতুন কিছু আবিষ্কার করে ফেলে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ক্রাশটা আরো মারাত্মক হতে পারত। কিন্তু সরকারি হস্তক্ষেপে আপাতত সেই ভারটা বাজার বহন করে চলেছে। এই সমস্যার দুটো সমাধান ছিল।
এক. বাজারকে বাজারের মতো চলতে দেয়া। ক্রাশ হতে হতে একপর্যায়ে ক্রাশ হওয়া বন্ধ হয়ে যেত। তখন সস্তায় শেয়ার কেনার জন্য অনেকেই এগিয়ে আসত। দুই. পতনের মুখে বাজারকে ঠেকা দেয়া। জনস্বার্থে অনেক দেশের সরকার তা করে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে, বাজারটা সহনীয় কি না। অনেক অর্থনীতিবিদই বাজারকে কৃত্রিমভাবে ওপরে ধরে রাখার ঘোর বিরোধী। তারা বলেন, বাজার যদি অর্থনীতির আগে চলে, তাহলে বারবার বিপদ আসবে। তবে সত্য হলো, শেয়ারবাজার অর্থনীতির আগেও চলে আবার পেছনেও চলে। জোয়ারের সময় আগে চলে, ভাটার সময় পেছনে চলে। তবে আমাদের বাজারে ভাটার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এখনো অনেক শেয়ার অতি মূল্যায়িত।
লেখক : অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ০২/০৩/১১] |