এবার খেলা আমিই জমাব
'এবার খেলা আমিই জমাব।’ শেয়ারবাজারের কারসাজির তদন্তের বিষয়ে ডিএসইর সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান এভাবেই সমকালের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কীভাবে খেলা জমাবেন তিনি_ এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন,
‘সময় হলেই দেখবেন।’ শেয়ারবাজারের কারসাজির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বা কখনও ছিল না_ এমন দাবি করে ডিএসইর সাবেক সভাপতি ও মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিবেদনে তার নাম যুক্ত করা হয়েছে। তবে নিজের ব্রোকারেজ হাউস থাকা সত্ত্বেও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস থেকে শেয়ার কেনাবেচা করেছেন_ এমন অভিযোগ স্বীকার করলেও এর কারণ সম্পর্কে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার সরকারের কাছে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের কমিটি সরকারের উচ্চ পর্যায়কে যে দুই ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে তাদের মধ্যে ডিএসইর সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান একজন। তদন্ত কমিটির অভিযোগ, ডিএসইর এ সাবেক সভাপতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসিকে প্রভাবিত করে অনেক অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। ‘৯৬-এর শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির বিষয়ে গঠিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম চৌধুরীর তদন্ত কমিটিও তাকে প্রধান অভিযুক্ত করেন।
রকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস থেকে ১২০৪০৯০০২০৪৪৮৭৭৩ নম্বর বিও হিসাব থেকে শেয়ার কেনাবেচায় জড়িত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় আইডিএলসি সিকিউরিটিজ, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট ব্রোকারেজ হাউস থেকে শেয়ার কেনাবেচা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা তার বিও হিসাবের গোপনীয়তা বজায় রাখতেন। তবে নিজের ব্রোকারেজ হাউসে (মিডওয়ে) দুটি এবং শাহ্জালাল ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউসে একটি বিও হিসাব রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন রকিবুর রহমান। তিনি দাবি করেন, ‘আমার বিও হিসাবগুলো থেকে কোনো অনৈতিক শেয়ার ব্যবসায় কখনোই জড়িত ছিলাম না। আর আমি যে ধরনের ব্যবসা করেছি তাতে আমার ওপর অন্তত পাঁচ লাখ লোক রয়েছে। আমাকে ধরলে তাদেরও ধরতে হবে।’
নিজের ব্রোকারেজ হাউস থাকা সত্ত্বেও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউস থেকে কেন শেয়ার কেনাবেচা করেছেন_ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আশ্চর্য! আমি তো ঋণ নেওয়ার জন্য ওখানে অ্যাকাউন্ট খুলেছি। আর কিচ্ছু না। আমার তো অত টাকা নেই। আমি ভালো শেয়ার ছাড়া খারাপ শেয়ার কিনিনি। আমার বিনিয়োগ বড়জোর তিন থেকে চার কোটি টাকা।’ এদিকে যমুনা অয়েলের শেয়ার কারসাজির সঙ্গে রকিবুর রহমান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এ অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। ‘এ ধরনের প্রশ্ন করার যৌক্তিকতা নেই’_ এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি তো এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেনি। আপনি কেন বলছেন?’ তিনি জানান, তাকে ধরার জন্য তার বিও হিসাবের সব তথ্য তদন্ত কমিটি নিয়েছে। এ অবস্থায় তদন্ত কমিটি রকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি বা অনিয়মের বিষয়গুলো ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে গেছে, এমন অভিযোগ তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে আনা যায় কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আপনার প্রশ্নই বুঝতে পারছি না। এসব প্রশ্ন তদন্ত কমিটি তোলেনি। আপনি কেন তুলছেন?’
রকিবুর রহমানের বিরুদ্ধে গত বছর যমুনা অয়েলের শেয়ার কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু তিনি তার বিও হিসাবে কখনোই যমুনা অয়েলের শেয়ার ছিল না বলে দাবি করেন। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৯ সালের ১০ নভেম্বর তার শাহ্জালাল ব্যাংকের বিও হিসাবে ৫ হাজার শেয়ার ছিল। একই সালের ২৩ জুলাই তার ওই বিও হিসাবে যমুনা অয়েল কোম্পানির শেয়ার ছিল ১০ হাজার। একই সময় তার ওই হিসাবে তিতাস গ্যাস কোম্পানির শেয়ার ছিল ৪০ হাজার।
ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত প্রতিবেদনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি বলেছে, রকিবুর রহমান ইনফ্লুয়েন্স (এসইসিকে প্রভাবিত) করছে। কী ইনফ্লুয়েন্স করছি আমি? এর মাধ্যমে আমি কী বেনিফিট নিয়েছি? আমি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক প্রেসিডেন্ট, একজন স্টেকহোল্ডার; পুঁজিবাজারের নেতৃত্বে এসেছিলাম। আমি পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অনেক কিছু করেছি। এসইসির সঙ্গে সারাক্ষণ মিটিং করতে হয়। এটা আমার কাজ। তাই করেছি। অনৈতিক কাজে তো প্রভাবিত করিনি।’ সরাসরি তালিকাভুক্তি (ডিরেক্ট লিস্টিং) পদ্ধতি বন্ধ করা তার কৃতিত্ব দাবি করে ডিএসইর সাবেক সভাপতি তদন্ত কমিটির সমালোচনা করে বলেন, ‘ইব্রাহিম খালেদ তো অনেক কথা লিখেছেন। এটা কেন লিখলেন না, রকিবুর রহমান আর কিছু পারুক বা না পারুক ডিরেক্ট লিস্টিং বন্ধ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘শেয়ারবাজারে নতুন শেয়ার আনার জন্য অনেক কিছু করেছি। বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্য এমন কিছু নেই, যা করিনি। বিনিয়োগকারীদের বলেছি, আপনারা শেয়ার কিনবেন না। সরকারকে বলেছি, বাজার ওভার হিটেড (অতিমূল্যায়িত) হয়ে যাচ্ছে, শেয়ার ছাড়ুন। বেসরকারি কোম্পানির শেয়ার আনার জন্য হোটেল শেরাটনে মিটিং করেছি। আমি জিয়াউল হক খন্দকার, মনসুর আলমকে কী প্রভাবিত করেছি।’
কেন তদন্ত কমিটি আপনার সম্পর্কে এমন মন্তব্য করল_ এমন প্রশ্নের জবাবে রকিবুর রহমান বলেন, ‘আমি জানি না। তবে যারা শক্তিশালী পুঁজিবাজার চায় না, তারাই আমাকে টার্গেট করেছে। আমার পরিশ্রম, জনপ্রিয়তায় যারা ঈর্ষান্বিত, তারাই এ কাজ করিয়েছে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, “আমাকে আঘাত করার অর্থ পুঁজিবাজারকে আঘাত করা। যারা চায় না শেয়ারবাজার স্থিতিশীল থাকুক, তারাই হয়তো এমনটা করতে তদন্ত কমিটিকে আমার বিরুদ্ধে প্রভাবিত করেছে।” কারা তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে সে বিষয়ে রকিবুর রহমান বলেন, ‘তাদেরই (তদন্ত কমিটি) জিজ্ঞেস করুন, কাদের দ্বারা তারা প্রভাবিত।’