 Forum Addict

Regist.: 12/31/2010 Topics: 14 Posts: 92
 OFFLINE | লেখক: মনির হোসেন | রবি, ১৫ মে ২০১১, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮
Daily Ittefaq
দৈত্যদের কাছে সরকারের অসহায় আত্মসমর্পণ
কার নির্দেশে মাস্তান দিয়ে এসইসির সত্ কর্মকর্তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?
এসইসি-বাংলাদেশ ব্যাংক চলছে স্নায়ুযুদ্ধ
দুষ্টচক্রের বিচারের পরিবর্তে লুটপাটের নতুন ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে
দেশের শেয়ারবাজার এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন। নিজেদের খেলার মাঠ মনে করে দুর্বৃত্তরা এখন দৈত্যের মতো চষে বেড়াচ্ছে। এরা কখনও দরবেশের বেশে, আবার কখনও জিনের বাদশা হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। সরকারও এদের চরম আপন ভেবে লুটপাটের সব ধরনের সুযোগ করে দিচ্ছে। শেয়ারবাজার কারসাজির তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এ মহলটির সীমাহীন অপকর্মের তথ্য প্রকাশিত হলেও এদের শাস্তি না দিয়ে সরকার তাদের জামাই আদরে রেখেছে। আর এদের বাছাই করা লোকজনকে নিয়ন্¿ক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) দায়িত্ব দিচ্ছে। একইসঙ্গে মাস্তান দিয়ে এসইসির সত্ কর্মকর্তাদের অফিস থেকে ধরে নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। আর মানুষের কাছে সত্ ও দক্ষ এসব সদস্যের পদত্যাগের নাটক সাজানো হয়েছে। ফলে দেশের শেয়ারবাজার এখন দৈত্যদের দখলে। ১৯৯৬ সালেও এরা দোষী চিহ্নিত হয়েছিল। তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের প্রতি দৈব শক্তির নজর পড়েছে। এসব কারণে বিশ্লেষকরা প্রশ্ন করছেন, সরকার ইচ্ছা করেই এসব করছে, নাকি দৈত্যদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করছে? অন্যদিকে তদন্ত কমিটির সুপারিশে এসইসি-বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ের কথা বলা হলেও এখন দুটি প্রতিষ্ঠানে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তাকে এসইসিতে সহ্য করা হচ্ছে না। এ কারণে অনিশ্চিত গন্তব্যে চলছে শেয়ারবাজার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসইসির মতো সংস্থার মেম্বার পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অফিস থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া কোনো সভ্য দেশে হতে পারে না।
যেভাবে এসইসির সদস্যদের পদত্যাগ পত্র আদায় করা হয়
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এসইসির মূল গেটের নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, বিকেল ৪টা পর্যন্ত এখানে সাংবাদিক প্রবেশ নিষিদ্ধ। কে এই নির্দেশ দিয়েছে জানতে চাইলে নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে। এর আগে সাদা পোশাকে দু’জন লোক এসইসির সদস্য ইয়াছিন আলীর রুমে আসেন। তাদের মধ্যে একজন লম্বা এবং ফর্সা, অন্যজন শ্যাম বর্ণের। দু’জনের সঙ্গে ছিল আগ্নেয়াস¿। রুমের ভেতরে প্রবেশ করেই তারা ইয়াছিন আলীকে পদত্যাগ করতে বলেন। পরিচয় জানতে চাইলে তারা জানান, সরকারের ওপর মহলের নির্দেশে এসেছেন এবং পদত্যাগপত্র নিয়ে যাবেন। ইয়াছিন আলী পদত্যাগের কারণ জানতে চান। বাকবিত ার এক পর্যায়ে ইয়াছিন আলী বলেন, অর্থমন্¿ী দেশে এলে আমি তার কাছে পদত্যাগ পত্র দেব। এ সময় তারা জানান, ভালো চাইলে এ মুহূর্তে পদত্যাগ করতে হবে। ইয়াছিন আলী বলেন, আপনারা আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যান। জবাবে উচ্চকণ্ঠে তারা বলেন, কেন বুঝছেন না, আপনার পদত্যাগ করতে হবে এটা শেষ কথা। আমরা যে কোনো মূল্যে আপনার পদত্যাগপত্র নিয়ে যাব। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য আপনিই দায়ী। আপনি পদত্যাগ করলে এক সপ্তাহের মধ্যে বাজার ভালো হয়ে যাবে। এ সময়ে ইয়াছিন আলী টেলিফোনে দু’একজনের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলে কোথাও আলাপ করা যাবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। ইয়াছিন আলী বলেন, কারও সঙ্গে আলাপ না করে তিনি পদত্যাগ করবেন না। আপনারাও অপেক্ষা করেন, আমিও অপেক্ষা করি। পরবর্তী সময়ে টেলিফোনে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হলে ইয়াছিন আলী একজন ডিআইজিকে ফোন করে জানতে চান, পুলিশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা থেকে তাদের পাঠানো হয়েছে কি-না। ডিআইজি জানান, তার জানা মতে, তাদের কোনো লোক পাঠানো হয়নি। এ সময় ডিআইজি তাদের কাছে মোবাইল দিতে বললে তারা জানান ডিআইজির সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের নেই। এরপর সংশ্লিষ্ট জায়গায় খোঁজ-খবর নিয়ে ডিআইজি জানান, উপরের নির্দেশে তাদের পাঠানো হয়েছে। এখন পদত্যাগ না করলে তারা শারীরিকভাবে অপমান করবে। ইয়াছিন আলী তারপর একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর সঙ্গে আলাপ করলে তিনিও জানান, এখন পদত্যাগ করাই হবে সম্মানের কাজ। না হলে এরা শারীরিকভাবে অপমান করবে। এরমধ্যে সময় দুপুর ২টার কাছাকাছি চলে এসেছে। ইয়াছিন আলী এ সময়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে টেলিফোন করে জানতে চান কখন তিনি পদত্যাগপত্র নিয়ে আসবেন। সচিব পৌনে ৩টায় সময় দেন।
এর মধ্যে তাদের সামনেই ইয়াছিন আলী জোহরের নামাজ আদায় করে পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে ইয়াছিন আলীর গাড়িতেই ৩ জন সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। এ সময় তারা সচিবালয়ের গেটে ফোন করে জানান, তারা সরাসরি প্রবেশ করবেন। তাদের যেন গেটে বাধা না দেওয়া হয়। সচিবালয়ে এসে তারা তিনজনই সরাসরি সচিবের রুমে ঢুকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। বাইরে এসে তারা ইয়াছিন আলীকে বলেন, কিছু মনে করবেন না। আপনি আমাদের বাবার বয়সী। আর এটাই আমাদের কাজ। এর আগের দিন একই ব্যবহার করা হয়েছে অপর সদস্য আনিসুজ্জামানের সঙ্গে।
এসইসির সত্ সদস্যদের পদত্যাগের নেপথ্যে
জানা গেছে, ইয়াছিন আলী কমিশনের বিভিন্ন বৈঠকে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ নিয়ে কথা বলতেন। ফলে দুর্বৃত্তদের বিপক্ষে অবস্থান ছিল তার। তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ আনা সম্ভব হয়নি। এ পর্যন্ত কমিশনের ৪০টির বেশি সিদ্ধান্তের ওপর তিনি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। অর্থাত্ কমিশন সিদ্ধান্ত নিলেও এসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তার আপত্তি ছিল। তবে কমিশনের বেশির ভাগ সদস্যের সম্মতি থাকায় ইয়াছিন আলীর বিরোধিতা থাকা সত্যেও ওই সিদ্ধান্ত পাস হয়ে যায়। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যমন্¿ী ফারুক খানের পারিবারিক কোম্পানি খুলনা পাওয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ। গ্রিনফিল্ডের একটি কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার নির্দেশক মূল্য ১৬২ টাকা নিয়ে এর তালিকাভুক্তির বিরোধিতা করেন তিনি। এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের প্লেসমেন্ট শেয়ার বাতিল এবং মবিল যমুনার অতিরিক্ত নির্দেশক মূল্য নিয়ে অনুমোদনের বিরোধিতা করেন তিনি। এছাড়া শুধু ইয়াছিন আলীর বিরোধিতার কারণে বেক্সিমকো টেক্সটাইলের ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করার পর এক বছরের লকিং দিতে বাধ্য হয় এসইসি। এসব কারণে সরকারের ভেতরে ও বাইরের অসম্ভব শক্তিশালী গ্রুপটি প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ইয়াছিন আলীর বিপক্ষে রিপোর্ট দেয়। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্¿ীর এক উপদেষ্টা সরকারকে প্রভাবিত করেছে।
শেয়ারবাজার তদন্ত রিপোর্ট দেওয়ার পরপরই প্রভাবশালী একটি গ্রুপ এসইসির সত্ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে ওঠে। তাদের ধারণা, এরাই দুর্নীতিবাজদের তথ্য তদন্ত কমিটিকে দিয়েছে। ফলে এর আগে প্রধানমন্¿ীর দপ্তর এবং অর্থ মন্¿ণালয়ের যেসব কর্মকর্তা প্লেসমেন্ট সুবিধা নিয়েছেন ওইসব কর্মকর্তার মাধ্যমে বিভিন্ন ষড়যন্¿ করা হয়। ইয়াছিন আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি শেয়ারবাজারে কারসাজির ঘটনা তদন্ত কমিটিকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।
তদন্ত কমিটির সুপারিশ এবং সরকার যা করছে
তদন্ত কমিটি শেয়ারবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য এসইসির পুনর্গঠনের সুপারিশ করে। এছাড়াও সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সরকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অসাধু এ মহলটি এসইসির সত্ কর্মকর্তাদের চাপ দিয়ে পদত্যাগ করিয়ে লুটেরাদের রাজত্ব কায়েম করতে চাচ্ছে।
এসইসি-বাংলাদেশ ব্যাংক স্নায়ুযুদ্ধ
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আর্থিকখাতের দুটি নিয়ন্¿ক সংস্থা এসইসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয় থাকার কথা। তদন্ত কমিটির সুপারিশেও একই কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে দুটি প্রতিষ্ঠানে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এসইসি এবং প্রধানমন্¿ীর একজন উপদেষ্টা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো লোককে এসইসিতে দেখতে চান না। দৈবশক্তিরও একই দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আমজাদ হোসেনের নিয়োগ চূড়ান্ত করার পরও শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে তাকে আবার বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা যা ভাবছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বাকী খলীলীর মতে, শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থা একেবারেই অস্বাভাবিক। তার মতে, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুসারে এসইসির পুনর্গঠনের ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে পরিষ্কার কোনো ম্যাসেজ এখনও বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হয়নি। এছাড়াও তদন্তে যাদের নাম এসেছে তাদের ব্যাপারেও কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে এখনও বাজার ওই চক্রের হাতে রয়ে গেছে। তিনি বলেন, এসইসির পুনর্গঠন এবং দোষীদের শাস্তি দিয়ে সরকারের মেসেজ দেওয়া উচিত যে সরকার এ অবস্থার পরিবর্তন চায়। |